সিংহলে বুদ্ধের দস্তধাতু বিবরণ
মহাপরিনির্বাণ সূত্রে বুদ্ধের দেহধাতু সম্পর্কে বলা হয়েছে-
“চত্তালাস সমাদন্তা কেসা লোমা চ সব্বসো,
দেবা হরিংসু একেকং চক্কবাল পরম্পরাতি।”
অর্থাৎ- তথাগতের চল্লিশটি দন্তের মধ্যে অবশিষ্ট দন্ত, কেশ ও লোম ধাতুসমূহ চক্রবাল পরম্পরার দেবগণ এক একটি চক্রবালে একটি করে নিয়ে গিয়ে স্থাপন করে পূজা করছেন।
এখানে বুদ্ধের দেহধাতুর বিস্তৃত পরিসরে সংরক্ষণ ও পূজার একটি ঐতিহ্যবাহী বিবরণ পাওয়া যায়। বিশেষভাবে বুদ্ধের চারটি মহাদন্তধাতুর কথা বিভিন্ন বৌদ্ধ ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে-
“একাহি দাঠা তিদিবেহি পূজিতা,
একাপুন গন্ধার পুরে মহাযতি,
কালিঙ্গ রঞ্জঞো বিজিতে পুনেকং,
একং পুন নাগরাজা মহেতি।”
অর্থাৎ- তথাগতের চারটি প্রধান দন্তধাতুর মধ্যে- একটি দন্ত ত্রিদিববাসী দেবগণ কর্তৃক পূজিত হচ্ছে; একটি দন্ত গান্ধার রাজ্যে পূজিত হচ্ছে; একটি দন্ত কলিঙ্গ রাজার রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পূজা পাচ্ছে; অপর একটি দন্ত নাগলোকে নাগরাজ কর্তৃক পূজিত হচ্ছে।
এই চারটি মহাদন্ত ধাতুর মধ্যে কলিঙ্গ রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত দন্তধাতুটিই পরবর্তীকালে সিংহলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে বর্ণিত হয়েছে। এই চারটি মহাদন্তধাতুর উল্লেখ ধাতুবন্দনাতেও পাওয়া যায়-
“একাদাঠা তিদসপুরে, একানাগপুরে অহু,
একা গন্ধার বিসয়ে, একাসি পুনঃ সীহলে।
চতসো তা মহাদাঠা নিব্বান রস দীপিকা,
পূজিতা নরদেবেহি তা’পি বন্দামি ধাতুযো।”
এর অর্থ- ভগবান বুদ্ধের একটি দন্ত স্বর্গের ত্রিদশালয়ে, একটি নাগলোকে, একটি গান্ধার রাজ্যে এবং অপর একটি সিংহল দ্বীপে রয়েছে। নির্বাণের রসোদ্দীপক এই চারটি মহাদন্ত নর ও দেবগণের দ্বারা পূজিত হয়। আমিও সেই চারটি মহাদন্ত ধাতুকে বন্দনা করছি।
বুদ্ধের এই চার মহাদন্তধাতুর মধ্যে কলিঙ্গে প্রতিষ্ঠিত দন্তধাতুটিই পরবর্তীকালে সিংহলদ্বীপে স্থানান্তরিত হয়। সেই দন্তধাতুকে কেন্দ্র করে সিংহলে বৌদ্ধ রাজা, ভিক্ষুসংঘ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ পূজা-ঐতিহ্যের বিকাশ ঘটে। পরবর্তীকালে এই দন্তধাতু সিংহলের বৌদ্ধ রাজশক্তি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়।
কলিঙ্গ রাজ্যে দন্তধাতুর প্রতিষ্ঠা
বুদ্ধের চারটি মহাদন্তধাতুর মধ্যে একটি দন্তধাতু ক্ষেম নামক ভিক্ষু গ্রহণ করে কলিঙ্গ রাজ্যের রাজা ব্রহ্মদত্তের নিকট প্রদান করেছিলেন। রাজা ব্রহ্মদত্ত তাঁর রাজধানীতে একটি চৈত্য নির্মাণ করে সেখানে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু প্রতিষ্ঠা করেন এবং যথাযথভাবে পূজা করতে থাকেন। বর্ণিত আছে, রাজা ব্রহ্মদত্ত দন্তধাতুর পূজা করে মৃত্যুর পর দেবলোকে জন্মগ্রহণ করেন। এভাবে পরবর্তীকালে বহু রাজা বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর পূজা করে পুণ্য অর্জন করেছিলেন এবং মৃত্যুর পর দেবলোকে জন্মলাভ করেছিলেন বলে বৌদ্ধ ঐতিহ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়।
পরবর্তীকালে কলিঙ্গের রাজা গুহশিব তাঁর পূর্বের মিথ্যাদৃষ্টি ত্যাগ করে ত্রিরতেœর প্রতি প্রসন্নচিত্ত হলেন। তিনি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তির সঙ্গে বুদ্ধের দন্তধাতুর পূজা করতে শুরু করেন। রাজা গুহশিবের এই দন্তধাতু পূজার কারণে কয়েকজন জৈন সন্ন্যাসী তাঁর প্রতি বিরাগভাজন হন। একপর্যায়ে রাজা তাঁদের রাজ্য থেকে বিতাড়িত করেন। বিতাড়িত হয়ে নিগ্রন্থ সন্ন্যাসীরা জম্বুদ্বীপের অধিপতি রাজা পা-ুর নিকট আশ্রয় গ্রহণ করলেন। তাঁরা রাজা পাণ্ডুর কাছে গিয়ে বললেন- “মহারাজ, আপনি ব্রহ্ম ও শিব প্রভৃতি দেবতাদের পূজা করেন। কিন্তু আপনার সামন্ত রাজা গুহশিব আপনার পূজিত দেবতাদের নিন্দা করে একজন মৃত ব্যক্তির অস্থি অর্থাৎ বুদ্ধের দন্তধাতুর পূজা করছেন।” এই কথা শুনে রাজা পা-ু ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি তাঁর সামন্ত রাজা চিত্তয়ানকে আদেশ দিলেন- “তুমি কলিঙ্গ রাজ্যে গমন করে গুহশিব রাজাকে বন্দী করে আমার নিকট নিয়ে এসো।”
রাজার আদেশ পেয়ে চিত্তয়ান চর্তুরঙ্গিনী সৈন্যবাহিনী নিয়ে কলিঙ্গ রাজ্যের অনতিদূরে এসে শিবির স্থাপন করলেন। কলিঙ্গরাজ গুহশিব তাঁর আগমনের সংবাদ পেয়ে রাজা চিত্তয়ানকে বিভিন্ন উপঢৌকন প্রদান করে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করলেন। এরপর রাজা চিত্তয়ান কলিঙ্গরাজ গুহশিবের রাজপ্রাসাদে উপস্থিত হলেন এবং রাজা পা-ুর আদেশ তাঁকে অবহিত করলেন। রাজা গুহশিব তখন তাঁকে বুদ্ধের দন্তধাতুর বিভিন্ন অলৌকিকত্ব ও মাহাত্ম্য প্রদর্শন করলেন। চিত্তয়ান বুদ্ধের দন্তধাতুর সেই অলৌকিক ঋদ্ধি প্রত্যক্ষ করে গভীরভাবে অভিভূত হলেন। তিনি বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠলেন এবং অবশেষে সৈন্য-সামন্তসহ বুদ্ধের শরণ গ্রহণ করলেন। এইভাবে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর মাহাত্ম্য রাজা চিত্তয়ানের হৃদয়ে গভীর পরিবর্তন সাধন করল। তিনি পূর্বের দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করে ত্রিরতেœর প্রতি শ্রদ্ধা স্থাপন করলেন।
দন্তধাতুর মহিমায় রাজা পাণ্ডর বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ
রাজা গুহশিব নানা উপকরণ দিয়ে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু পূজা করতে করতে পাটলিপুত্র নগরে উপস্থিত হলেন। রাজা পা-ু জনসভার মধ্যে গুহশিবকে কোনো প্রকার ভয়-ভীতি ছাড়াই অবস্থান করতে দেখে ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি নিগ্রন্থ সন্ন্যাসীদের বললেন- “বন্দনীয় দেবতাদের ত্যাগ করে একজন মৃত ব্যক্তির অস্থি পূজা করা হচ্ছে। এই ধাতুর উপর জ্বলন্ত কয়লা নিক্ষেপ করে একে জ্বালিয়ে ফেল।” রাজার আদেশে নিগ্রন্থ সন্ন্যাসীরা আনন্দচিত্তে রাজাঙ্গনে অগ্নি প্রজ্বলিত করল এবং জ্বলন্ত কয়লারাশি ভর্তি একটি গর্তে বুদ্ধের দন্তধাতু নিক্ষেপ করল।
তখন দন্তধাতুর অলৌকিক শক্তির প্রভাবে জ্বলন্ত কয়লারাশির অভ্যন্তর থেকে রথচক্রের মতো বিশাল ও রেণুজালবিশিষ্ট একটি পদ্মফুল ফুটে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে দন্তধাতু পদ্মের কোণে স্থিত হয়ে কুন্দফুলের মতো শুভ্র জ্যোতি বিকীর্ণ করতে লাগল। সেই জ্যোতিতে চারদিক আলোকিত হয়ে উঠল। উপস্থিত জনম-লী এই আশ্চর্য ঘটনা দেখে মিথ্যাদৃষ্টি ত্যাগ করল এবং ভক্তিভরে দন্তধাতুর পূজা করতে শুরু করল। কিন্তু রাজা পা-ু তখনও বহুদিনের পোষিত মিথ্যাদৃষ্টি ত্যাগ করতে পারেননি। তিনি দন্তধাতুটিকে একটি নিহিত বা পাথরের উপর রেখে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলেন। আঘাতের ফলে দন্তধাতুটি পাথরের মধ্যে অর্ধেক প্রবেশ করল এবং উদয়াচল থেকে কিরণ বিকীর্ণকারী সূর্যের মতো তার জ্যোতিতে চারদিক উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। রাজা পা-ু দন্তধাতুর এই অলৌকিক শক্তি দেখে বিস্মিত হলেন।
এমন সময় জনৈক ঈর্ষাপরায়ণ নিগ্রন্থ রাজাকে বলল- “পৃথিবীতে রাম-জনার্দনের নানা অবতার আছেন। এই শবাস্থি জনার্দনের দেহের একাংশ। যদি এটি জনার্দনের দেহাংশ না হয়, তাহলে এটি কীভাবে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন হতে পারে?” রাজা পা-ু তখন তীর্থিকদের বললেন- “যদি এটি রাম-জনার্দনের দেহাংশ হয়ে থাকে, তাহলে তোমরা তাঁর নানা গুণ বর্ণনা করে নিহিতে প্রবিষ্ট দন্তধাতুটিকে আমার সম্মুখে নিয়ে এসো এবং তোমাদের ইচ্ছামতো সামগ্রী গ্রহণ করো।” তীর্থিক সন্ন্যাসীরা বিষ্ণুর নানা গুণ বর্ণনা করে দন্তধাতুর উপর জল সিঞ্চন করল। কিন্তু দন্তধাতু যেখানে ছিল, সেখানেই রয়ে গেল; কোনোভাবেই তা পাথরের ভিতর থেকে বের হলো না। রাজা তখন তীর্থিকদের নিন্দা করে দন্তধাতু বহির্গত করার উপায় অনুসন্ধান করতে লাগলেন।
অবশেষে নগরভেরী বাজিয়ে ঘোষণা করা হলো- “যিনি নিহিতে প্রবিষ্ট দন্তধাতু বের করতে পারবেন, তিনি রাজার নিকট থেকে বিপুল সম্পত্তি লাভ করে সুখে জীবনযাপন করবেন।” মহাভেরীর শব্দ শুনে পুণ্য অর্জনের মানসে এক শ্রেষ্ঠীপুত্র শুভদ্র রাজসভায় উপস্থিত হলেন। তিনি রাজাকে প্রণাম করে নির্ভীকচিত্তে হৃদয়গ্রাহী সুন্দর ভাষায় সর্বজ্ঞ বুদ্ধের গুণাবলি জনসমবেত মানুষের সামনে বর্ণনা করতে লাগলেন। সেই মুহূর্তে জিনের দন্তধাতু আকাশে উঠে শুকতারার মতো জ্যোতি বিকীর্ণ করে চারদিক উদ্ভাসিত করল। এর ফলে মানুষের মনে থাকা সন্দেহ দূরীভূত হলো এবং সকলের মধ্যে আনন্দের সঞ্চার হলো। এরপর দন্তধাতু আকাশ থেকে অবতরণ করে ভক্তিতে নিমগ্ন শ্রেষ্ঠীপুত্র শুভদ্রের মন্তকের উপর অবস্থান করল এবং তাঁকে আনন্দ প্রদান করল।
নিগ্রন্থ সন্ন্যাসীরা এই অলৌকিক ঘটনা দেখে রাজা পা-ুকে বলল- “দেব, এটি ধাতুর অলৌকিক শক্তি নয়; এটি শ্রেষ্ঠীপুত্রের ঋদ্ধিশক্তি।” রাজা তাঁদের কথা শুনে শ্রেষ্ঠীপুত্র শুভদ্রকে বললেন- “যাতে এদের বিশ্বাস হয়, সেরূপ ঋদ্ধি প্রদর্শন কর।” তখন শুভদ্র দন্তধাতুর অলৌকিক কার্যাবলি স্মরণ করে সুগন্ধ ও সুশীতল জলে পূর্ণ একটি স্বর্ণপাত্র প্রস্তুত করলেন এবং তাতে দন্তধাতু স্থাপন করলেন। দন্তুধাতুটি সেই সুগন্ধ জলের মধ্যে রাজহংসের ন্যায় ইতস্তত বিচরণ করতে লাগল। পরে পাত্রটি প্রদক্ষিণ করে একবার জলে নিমজ্জিত হলো এবং পুনরায় জলের উপর উঠে সকলকে আনন্দ প্রদান করল।
এরপর শুভদ্র ভগবানের দন্তধাতু নিয়ে রাস্তার উপর একটি গর্ত তৈরি কওে সেখানে তা নিক্ষেপ করলেন। পরে গর্তটি ধূলা দিয়ে পূর্ণ করে বহু হাতির দ্বারা সেই স্থান পদপিষ্ট করানো হলো। কিছুক্ষণ পর চক্রের মতো মাটি ভেদ করে একটি মনোরম পদ্মফুল ফুটে উঠল। পদ্মটির পত্রসমূহ রজতরেণুর মতো উজ্জ্বল এবং কাঞ্চনপাত্রের মতো দীপ্তিমান ছিল। তৎক্ষণাৎ শাস্তার দন্তধাতু সেই মৃদুমন্দ বাতাসে দোদুল্যমান রেণুজালবিশিষ্ট সরোজের উপর স্থিত হলো এবং মুহূর্তের মধ্যে তার জ্যোতিতে চারদিক আলোকিত হয়ে উঠল। উপস্থিত লোকেরা বস্ত্র ও অলংকারাদি নিক্ষেপ করে দন্তধাতুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করল। পুষ্পবৃষ্টিতে চারদিক ভওে গেল। “সাধু! সাধু!” ধ্বনি ও করতালিতে সমগ্র নগর মুখরিত হয়ে উঠল।
অন্য তীর্থিকেরা তখনও দন্তধাতুর মাহাত্ম্য স্বীকার করতে রাজি হলো না। তারা রাজাকে বলল যে, এসবই প্রবঞ্চনামূলক কাজ। এই বলে তারা দন্তধাকুটিকে এমন একটি স্থানে নিক্ষেপ করল, যা পচা মৃতদেহ ও অন্যান্য অপবিত্র বস্তুর কারণে অত্যন্ত ঘৃণিত ছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেই স্থানটি একটি মনোরম পুষ্করিণীতে পরিণত হলো। পুষ্করিণীটি পঞ্চবিধ পদ্মে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। সেখানে ক্রীড়ারত রাজহংস দেখা গেল এবং মধুপানরত ভ্রমরদের গুঞ্জনে চারদিক মুখরিত হলো। স্থানটি যেন এক মনোরম নন্দ-পুষ্করিণীতে রূপান্তরিত হলো।
দন্তধাতুর এই অচিন্তনীয় অলৌকিক কার্যাবলি দেখে সমস্ত মন্ত্রী আনন্দিত হলেন। তাঁরা রাজা পা-ুর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁকে সৎকর্মে প্রবৃত্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তাঁরা বললেন- “হে মহারাজ, আপনিও শীঘ্রই দেবাতিদেব, পঞ্চমারজিত, শ্রেষ্ঠ ধর্মরাজ বুদ্ধের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা স্থাপন করলে স্বর্গ ও মোক্ষ লাভের পথ সুগম হবে।” মন্ত্রীদের কথা শুনে রাজা পা-ুর হৃদয়ে পরিবর্তন এলো। তিনি ত্রিরতেœর প্রতি সন্দেহমুক্ত ও প্রসন্নচিত্ত হলেন। জনসভার মধ্যে রাজা বললেন- “আমি বহুদিন কুপথে চলেছি। ভববন্ধন ছিন্নকারী ত্রিরতেœর গুণে বিশ্বাস স্থাপন না করে এতদিন আমি প্রতারিত হয়েছি। শীঘ্রই পরিখার নিকট গমন করে ধাতুর আরাধনা কর এবং দন্তধাতুটি এখানে নিয়ে এসো। আমি দন্তধাতুর পূজা করে সর্বত্র সুখপ্রদ পুণ্যকর্ম সম্পাদন করব।”
রাজার আদেশে সেনাপতি পরিখার নিকট গমন করলেন। তিনি অত্যন্ত সন্তুষ্টচিত্তে মুনীন্দ্রের দন্তধাতুকে নমস্কার করে রাজার মঙ্গল প্রার্থনা করলেন। এরপর দন্তধাতু পুনরায় রাজার নিকট নিয়ে আসা হলো। এইভাবে রাজা পান্ডু তাঁর বহুদিনের মিথ্যাদৃষ্টি পরিত্যাগ করে বুদ্ধের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলেন। দন্তধাতু প্রাসাদে ফিরে আসার পর ত্রিরতেœর প্রতি রাজার ভক্তি আরও বৃদ্ধি পেল। সেই সময়ে পুষ্করিণীগুলো বিচিত্র প্রস্ফুটিত স্বর্ণবর্ণ পদ্মে অলংকৃত হয়ে উঠল। আকাশ যেন মন্দাকিনী নদীর মতো স্বর্ণবর্ণ নতুন নক্ষত্রে সজ্জিত হলো। বুদ্ধের দন্তধাতু কুন্দফুলের মতো শুভ্র জ্যোতি বিকীর্ণ করে সমগ্র নগর আলোকিত করল। নগর যেন সমুদ্রের কুক্ষির মতো প্রতীয়মান হচ্ছিল এবং রাজহংসের পাল এক পদ্ম থেকে অপর পদ্মে অবতরণ করছে বলে মনে হচ্ছিল। জনসভার মধ্যে দন্তধাতুটি সেনাপতির অঞ্জলি-পদ্মে স্থিত হয়ে তাঁর মহোপকার সাধন করল। তখন তাঁর অঞ্জলি রক্তবর্ণ পদ্মের মতো প্রতীয়মান হলো।
এই সংবাদ শুনে রাজা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। তিনি পদব্রজে সেখানে উপস্থিত হয়ে দ্বিগুণ বিশ্বাসে অভিভূত হয়ে বললেন- “হে মুনীন্দ্র, দক্ষ ব্যবসায়ী যেমন ঘর্ষণ করে বিশুদ্ধ স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করে-এটি সনাতন ধর্ম। যেমন উৎকৃষ্ট আকর থেকে মণি উত্তোলন করা হলেও তাকে অগ্নিতে জ্বালিয়ে বিশুদ্ধ করে দক্ষ ব্যক্তিরা অলংকার ও রাজমুকুটে স্থাপন করেন, তেমনি, হে মুনীন্দ্র, তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য আমি সর্বপ্রকার উপায় অবলম্বন করেছি। হে মহাপ্রাজ্ঞ, এখন আমার অপরাধ ক্ষমা করুন এবং শীঘ্রই আমাকে অলংকৃত করুন।”তখন মণির মতো জ্যোতি বিকীর্ণকারী দন্তধাতু তাঁর মস্তকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে জনসমাবেশের মধ্যে স্নেহজাত ক্ষীরধারার মতো ধবল জ্যোতি প্রদান করল। রাজা দন্তধাতু শিরে বহন করে সমগ্র নগর প্রদক্ষিণ করলেন। এরপর পুষ্প দ্বারা পূজা করে সুসজ্জিত অন্তঃপুরে দন্তধাতু নিয়ে এলেন। সেখানে রতেœাজ্জ্বল শ্রেষ্ঠ পালঙ্কের উপর দন্তধাতু প্রতিষ্ঠিত করা হলো। তার উপর শ্বেতছত্র স্থাপন করে রতœাদি দ্বারা যথাযথ পূজা করা হলো।
এরপর রাজা পা-ু আজীবন বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের শরণ গ্রহণ করলেন। করুণায় পরবশ হয়ে তিনি হিংসা ত্যাগ করলেন এবং নিজের গুণ ও সদাচরণের মাধ্যমে সকল মানুষকে সন্তুষ্ট করলেন। দন্তধাতু সংরক্ষণের জন্য তিনি মণি দ্বারা সজ্জিত, সুচিত্রিত ও সুন্দর একটি মন্দির নির্মাণ করলেন। নানাভাবে দন্তধাতুর পূজা করেও তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। বরং দন্তধাতুর উদ্দেশ্যে সমস্ত সম্পত্তিসহ নিজের রাজ্য পর্যন্ত দান করলেন। এভাবে রাজা পা-ু আত্ম ও পরের হিতসাধন করলেন, দুর্জনের সংসর্গ ত্যাগ করলেন এবং জগতে মহৎ উপকার সাধন করলেন।
রাজা পা-ু যথাধর্ম পালন করে সুখে রাজত্ব করছিলেন। এমন সময় রাজা ক্ষীরধার যুদ্ধের সাজে সজ্জিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আগমন করলেন। রাজা পা-ু যুদ্ধে ক্ষীরধার রাজাকে পরাস্ত করলেন। এরপর রাজা পান্ডু তাঁর রাজ্যে বহু কল্যাণকর কাজ সম্পাদন করে নিজ পুত্রের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করলেন। পরবর্তীকালে তিনি রাজা গুহশিবের হাতে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু পুনরায় অর্পণ করে তাঁকে সসম্মানে তাঁর স্বরাজ্যে প্রেরণ করলেন। রাজা পান্ডু আজীবন পুণ্যকর্ম সম্পাদন করে মৃত্যুর পর দেবলোকে জন্মগ্রহণ করেন। এইভাবে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর অলৌকিক মাহাত্ম্য রাজা পা-ুর দীর্ঘদিনের মিথ্যাদৃষ্টি দূর করে তাঁকে ত্রিরতেœর প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। দন্তুধাতুর প্রতি তাঁর ভক্তি ও পূজা পরবর্তীকালে কলিঙ্গ থেকে সিংহলদ্বীপে দন্তধাতু স্থানান্তর ও সংরক্ষণের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।
দন্তধাতু নিয়ে দন্তকুমারের সিংহলে যাত্রা
রাজা গুহশিব বুদ্ধের পবিত্র দস্তধাতু নিজ রাজ্যে স্বসম্মানে নিয়ে এসে যথাস্থানে প্রতিষ্ঠা করে নানাভাবে পূজা করতে লাগলেন এবং এর মাধ্যমে বহু পুণ্য সঞ্চয় করতে থাকলেন। এই সময় উজ্জয়িনীর রাজপুত্র দন্তকুমার শৈশবকাল থেকেই বুদ্ধের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর পূজা করার উদ্দেশ্যে তিনি রাজা গুহশিবের নগরে আগমন করেন। দন্তকুমার কলিঙ্গ রাজ্যের সৌন্দর্য ও ঐশ্বর্যে অত্যন্ত মুগ্ধ হলেন। তিনি গভীর ভক্তির সঙ্গে প্রতিদিন বুদ্ধের দন্তধাতু পূজা করতে করতে কলিঙ্গ রাজ্যে বসবাস করতে লাগলেন।
রাজা গুহশিবের হেমমালা নামে এক সুন্দরী কন্যা ছিলেন। রাজা দন্তুকুমারকে সুবিমল কুলজাত, বহুগুণসম্পন্ন এবং আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার উপযুক্ত মনে করে সস্নেহে তাঁর সঙ্গে কন্যা হেমমালার বিবাহ দিলেন। বিবাহের পর রাজা গুহশিব দন্তকুমারকে বহু পরিজনসহ ভগবান বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করলেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন উপঢৌকন প্রদান করে তাঁকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করলেন। পরবর্তীকালে রাজা ক্ষীরধার যুদ্ধে নিহত হলে তাঁর ভাগিনেয় রাজকুমারেরা বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু গ্রহণের উদ্দেশ্যে বিপুল ও শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী সংগ্রহ করল। তারা দন্তপুরের পার্শ্ববর্তী মলয়বনে এসে শিবির স্থাপন করে রাজা গুহশিবের নিকট এমন এক কঠোর বার্তা পাঠাল- “সুগতের পবিত্র দন্তধাতু শীঘ্রই আমাদের প্রদান কর; অন্যথায় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।”
রাজা গুহশিব এই সংবাদ শুনে দন্তকুমারকে বললেন- “আমি যতদিন জীবিত আছি, ততদিন অন্য কারও হাতে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু তুলে দেব না। কিন্তু যদি আমরা তাদের পরাজিত করতে না পারি, তাহলে তোমরা দেব-নর পূজিত বুদ্ধের দন্তধাতু নিয়ে ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে লঙ্কাদ্বীপে গমন করবে।” এ কথা শুনে দন্তকুমার প্রশ্ন করলেন- “আমি কীভাবে সেখানে যেতে পারব?”
তখন রাজা গুহশিব তাঁর জামাতা দন্তকুমারকে বললেন- “সিংহলে দশবলের দেহধাতু বিদ্যমান এবং সেখানে শাস্তার ধর্ম প্রচলিত রয়েছে। বহু ভিক্ষুও সেখানে বসবাস করেন। আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু রাজা মহাসেন সেখানে শাস্তার চরণ গ্রহণ করে অবস্থান করছেন। তিনি দন্তধাতুর স্পর্শজল লাভের জন্য আমাকে বহু রতœ উপহার হিসেবে প্রেরণ করেছেন। সেই বুদ্ধিমান রাজা নিশ্চয়ই বন্দনীয় সুগতের পবিত্র দন্তধাতু যথাযথভাবে পূজা করতে সক্ষম হবেন।” এভাবে রাজা গুহশিব তাঁর জামাতা দন্তকুমারকে প্রয়োজনীয় উপদেশ প্রদান করে সৈন্যদল সংগ্রহ করলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে গমন করলেন। যুদ্ধে তিনি নিহত হলেন।
রাজকুমার দন্তকুমার তাঁর মামা ও শ্বশুর রাজা গুহশিবের মৃত্যুসংবাদ শুনে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু সঙ্গে নিয়ে দ্রুত নগর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন। দন্তকুমার দক্ষিণদিকে দ্রুত অগ্রসর হয়ে দেবতাদের ঋদ্ধিশক্তির প্রভাবে নিশ্চল জলপূর্ণ একটি মহতী নদী পার হলেন। এরপর বালুরাশির মধ্যে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু লুকিয়ে রাখলেন। পরে তিনি পুনরায় ছদ্মবেশে নগরে ফিরে এসে স্ত্রী হেমমালাকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন। তাঁরা বালুর অভ্যন্তরে রক্ষিত শাস্তার দন্তুধাতুর পূজা করতে করতে একটি ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নিলেন।
একদিন জনৈক স্থবির আকাশপথে গমন করার সময় বালুরাশির অভ্যন্তর থেকে দন্তধাতুর বিভিন্ন জ্যোতি নির্গত হতে দেখলেন। তিনি সেখানে অবতরণ করে দন্তধাতুর পূজা করলেন। দন্তকুমার ও হেমমালা স্থবিরকে দেখে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন এবং তাঁদের আগমনের কারণ ও সমস্ত ঘটনা তাঁকে জানালেন। স্থবির তাঁদের বললেন- “নিজেদের শারীরিক কষ্টের কথা চিন্তা না করে তোমরা দশবলের এই পবিত্র ধাতু সিংহলে নিয়ে যাও। পথে কোনো বিপদ উপস্থিত হলে আমাকে স্মরণ করবে।” এই উপদেশ প্রদান করে স্থবির আকাশপথে তাঁর নিজ আবাসে চলে গেলেন। সেই নদীর তলদেশের নাগলোকে ঋদ্ধিশক্তিসম্পন্ন পা-ুহার নামক এক নাগরাজ বাস করতেন। একদিন তিনি নিজের নগর থেকে বের হয়ে ইচ্ছামতো বিচরণ করতে করতে সেই স্থানে উপস্থিত হলেন। নাগরাজ বালুরাশির একটি গর্ত থেকে চন্দ্রের আলোর মতো জ্যোতি নির্গত হতে দেখে সেখানে অনুসন্ধান করলেন। তিনি বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু দেখতে পেলেন এবং তা গ্রহণ করলেন। অদৃশ্য শরীর ধারণ করে তিনি ভক্তিভরে দন্তধাতু-সংবলিত রতœময় কর-টি গিলে ফেললেন। এরপর নিজের বিশাল দেহ বিস্তৃত করে সুবর্ণময় উত্তুঙ্গ পর্বতরাজ সুমেরুকে বেষ্টন করে শুয়ে পড়লেন। এদিকে দন্তকুমার ও হেমমালা দন্তধাতুকে দেখতে না পেয়ে শোকে কাতর হয়ে অশ্রুপাত করতে লাগলেন। তাঁরা সেই স্থবিরের কথা স্মরণ করলেন। তখন স্থবির তাঁদের বিপদের কথা জানতে পেরে তাঁদের নিকট উপস্থিত হলেন। দিব্যচক্ষুর প্রভাবে তিনি জানতে পারলেন যে, রতœগিরির পার্শ্বে নাগরাজ দন্তধাতু নিয়ে শায়িত অবস্থায় আছে।
স্থবির তৎক্ষণাৎ বিহঙ্গপতি গরুড়ের রূপ ধারণ করলেন। তিনি তাঁর বিশাল পাখা বিস্তার করে অন্তরীক্ষ আবৃত করলেন। তাঁর পাখার প্রবল বায়ুবেগে গভীর জলরাশি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল এবং ভীষণ শব্দের সৃষ্টি হলো। সেই প্রবল বেগে তিনি দ্রুত মেরু পর্বতের পাদদেশে শায়িত নাগরাজের নিকট উপস্থিত হলেন। গরুড়রূপী স্থবিরকে দেখে নাগরাজ ভীত হয়ে পড়লেন। তিনি তৎক্ষণাৎ নাগরূপ ত্যাগ করে নিজের দেহ ক্ষুদ্র করলেন এবং দ্রুত এগিয়ে এসে ভিক্ষুর পদবন্দনা করলেন।
“সর্বজনের হিতার্থেই বুদ্ধগণ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেন। এই ধাতুর পূজা সর্বজনের জন্যই হিতকর। আমি এই মহার্ঘ জিনধাতুর পূজা করে অল্প কিছু কুশল সঞ্চয় করব- এই উদ্দেশ্যেই ধাতুটি গ্রহণ করেছিলাম। এখন এই ধাতু সত্য উপলব্ধিতে সক্ষম নরদের আবাসভূমি সিংহলদ্বীপে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অতএব, হে মুনিবর, আমাকে এই পবিত্র দেহধাতু ফিরিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিন।” স্থবিরের নির্দেশে নাগরাজ পা-ুহার দন্তকুমার ও হেমমালার নিকট বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু ফিরিয়ে দিলেন। স্থবির তাঁদের হাতে দন্তধাতু ফিওে যেতে দেখে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। দন্তকুমার ও হেমমালা ভক্তিভরে শান্তার পবিত্র দন্তধাতু মাথায় বহন করে সেই স্থান থেকে যাত্রা শুরু করলেন।
পথিমধ্যে বিভিন্ন দেবতা নানাভাবে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর মহাপূজা করলেন। দন্তকুমার ও হেমমালা বহু দুর্গম ও দুরতিক্রম্য পথ অতিক্রম করে ধীরে ধীরে তা¤্রলিপ্ত নামক বন্দরে এসে পৌঁছালেন। সেখানে তাঁরা লঙ্কাগামী একটি জাহাজ দেখতে পেলেন। জাহাজটি বণিকদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। দন্তকুমার ও হেমমালা সেই বণিকদের সঙ্গে জাহাজে আরোহণ করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল বায়ুর প্রভাবে জাহাজটি গরুড়ের মতো দ্রুতগতিতে সমুদ্রের বুকে চলতে লাগল। সমুদ্রযাত্রার একপর্যায়ে বহু নাগ তাঁদের সামনে উপস্থিত হলো। কেউ ভীমদর্শন ফণা বিস্তার করে, কেউ দিব্যবেশে সজ্জিত হয়ে হাতে সুগন্ধি পুষ্প ধারণ করে, কেউ মনোরম মণিময় প্রদীপ নিয়ে, আবার কেউ মস্তকে ফুলের থোপা ধারণ করে বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর পূজার জন্য এগিয়ে এল। কেউ স্কন্ধে কুমুদ ধারণ করল, কেউ কনকলস উত্তোলন করল, কেউ বায়ু সঞ্চালিত পতাকা বহন করল, কেউ স্বর্ণরেণুপূর্ণ মনোরম পেটিকা হাতে নিল। কেউ নৃত্য করতে লাগল, কেউ সুমধুর গান গাইতে লাগল এবং কেউ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে লাগল। এইভাবে নাগগণ নানা উপচারে মুনিবরের পবিত্র দন্তধাতুর পূজা করতে লাগল।
সেই সময় রাজকন্যা হেমমালার সুন্দও কেশগুচ্ছ ঋজু শলাকার মতো জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। মুনিবরের পবিত্র দন্তধাতু আকাশে উঠে নীল মেঘের অভ্যন্তর থেকে উদিত চন্দ্রকিরণের মতো চারদিকে আলো প্রদান করতে লাগল। দন্তধাতুর সেই অততুনীয় প্রভাব দেখে আকাশম-ল “সাধু! সাধু!” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। আনন্দিত নাগদের গর্জনেও চারদিক প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। এরপর শান্তার পবিত্র দন্তধাতু আকাশ থেকে অবতরণ করে রাজকন্যা হেমমালার কেশগুচ্ছের মধ্যে প্রবেশ করল। এই অলৌকিক দৃশ্য দেখে নাগগণ জাহাজের গতি থামিয়ে দিল এবং অত্যন্ত ভক্তির সঙ্গে সাত দিন ও সাত রাত বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর পূজা করল। সমুদ্রের মাঝখানে আকাশস্থিত অচল বিমানের মতো জাহাজের গতি সম্পূর্ণ থেমে যেতে দেখে দন্তকুমার ও হেমমালা ভয় ও উদ্বেগে সেই ঋদ্ধিমান স্থবিরকে স্মরণ করলেন।
সেই মুনিপুত্র তাঁদের চিন্তার বিষয় জানতে পেরে বৃহৎ গরুড়রূপ ধারণ করে আকাশে আবির্ভূত হলেন। তাঁর ভয়ংকর গর্জনে ভীত নাগগণ দ্রুত সেখান থেকে বিতাড়িত হলো। এইভাবে বুদ্ধপুত্র স্থবির সমদ্রপথের নাগভয় দূর কওে সেখান থেকে প্রস্থান করলেন। এরপর বায়ু-সঞ্চালিত পতাকার মতো দ্রুতগতিতে জাহাজটি তুঙ্গ তরঙ্গমালা ভেঙে সমুদ্রু অতিক্রম করতে লাগল। স্থবিরের ঋদ্ধিশক্তির প্রভাবে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই জাহাজটি মেঘমালার মতো দ্রুতগতিতে লঙ্কার বন্দরে এসে উপস্থিত হলো। এইভাবেই দন্তকুমার ও রাজকন্যা হেমমালা বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতু নিয়ে সিংহলদ্বীপে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছালেন।
সিংহলরাজ কিত্তিসিরিমেঘের দন্তধাতু সংরক্ষণ ও পূজা
সিংহলে মহাসেন রাজার পুত্র কিত্তিসিরিমেঘের রাজত্বের নবম বর্ষে দন্তকুমার ও হেমমালা বুদ্ধের দন্তধাতু নিয়ে বন্দরে উপস্থিত হয়ে এক ব্রাহ্মণের গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। পরদিন ব্রাহ্মণ তাঁদের অনুরাধাপুরের পথ দেখিয়ে দিলেন। দম্পতি বুদ্ধের দন্তধাতু সঙ্গে নিয়ে পদব্রজে যাত্রা করে অনুরাধাপুরের পূর্বদ্বারসংলগ্ন একটি গ্রামে উপস্থিত হলেন। সেখানে তাঁরা জানতে পারলেন যে, সিংহলরাজ মহাসেন ব্যাধির কারণে বহুদিন পূর্বেই পরলোকগমন করেছেন। এই সংবাদ শুনে তাঁরা গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেন এবং চারদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন বলে মনে হতে লাগল। পরে তাঁরা জানতে পারলেন যে, রাজা কিত্তিসিরিমেঘ ত্রিরতেœর প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত। এই সংবাদ তাঁদের মনে এমন আনন্দের সঞ্চার করল, যেমন পর্বতসংলগ্ন দাবানল বৃষ্টির জলে নির্বাপিত হলে প্রশান্তি আসে। মহাবিহারবাসী মেঘগিরি নামক এক ভিক্ষুর সঙ্গে রাজা কিত্তিসিরিমেঘের বন্ধুত্ব ছিল। এই কথা শুনে দন্তকুমার ও হেমমালা তাঁর কাছে গমন করলেন এবং আতিথ্য গ্রহণ করে দন্তধাতু আগমনের সংবাদ তাঁকে জানালেন। মুনিবর দন্তধাতুর কথা শুনে এমন আনন্দিত হলেন, যেন তাঁর সমগ্র দেহ অমৃতরসে সিক্ত হয়েছে। তিনি তখন অমল ও পবিত্র দন্তধাতুটিকে রেশমি চন্দ্রাতপে সজ্জিত একটি নিরাপদ কক্ষে সংরক্ষণ করলেন। ভিক্ষু মেঘগিরি দম্পতির বসবাসের সুবন্দোবস্তু করে এই শুভ সংবাদ রাজাকে জানানোর জন্য একজন ভিক্ষুকে প্রেরণ করলেন। একদিন বসন্তকালে রাজা কিত্তিসিরিমেঘ রাজকীয় নারীদের সঙ্গে উদ্যানে ক্রীড়া ও আনন্দ উপভোগ করছিলেন। এমন সময় তিনি দূর থেকে উজ্জ্বল বদনম-লবিশিষ্ট এক ভিক্ষুকে তাঁর দিকে আসতে দেখলেন। সংযমী সেই ভিক্ষু রাজার নিকট উপস্থিত হয়ে আনন্দিত মনে দন্তধাতু আগমনের সংবাদ জানালেন।
এই সংবাদ শুনে রাজা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি বহু পরিষদ সঙ্গে নিয়ে প্রসন্নচিত্তে অনুরাধাপুরের উত্তর-পূর্বদিকে অবস্থিত মেঘগিরি বিহারে পদব্রজে উপস্থিত হলেন। সেখানে শান্তার দুষ্পাপ্য দন্তধাতু দর্শন করে রাজা আনন্দাশ্রু বর্ষণ করতে লাগলেন। ভক্তিভরে অভিবাদন করে তিনি মনে মনে ভাবলেন- “আজ যদি আমার দুঃত্যাজ্য, বহুমূল্য রতœখচিত মস্তক দিয়েও আমি দন্তধাতুর পূজা করি, তবুও ত্রিলোকের একমাত্র আশ্রয়স্থল তথাগতের এই পবিত্র ধাতুর উপযুক্ত পূজা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” এই চিন্তায় তাঁর মুখম-ল অতিশয় আনন্দে পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি সর্বজ্ঞ বুদ্ধেও শ্রেষ্ঠ দন্তধাতুকে সমগ্র লঙ্কাদ্বীপের পক্ষ থেকে অর্ঘ্যস্বরূপ নিবেদন করে মহাসমারোহে পূজা সম্পাদন করলেন।
দন্তধাতুর সংবাদে কৌতূহলী হয়ে ত্রিপিটক, জাতক, তর্ক ও আগমশাস্ত্রে পারদর্শী বহু জ্ঞানী ভিক্ষু এবং নগরবাসী সেখানে সমবেত হলেন। তখন রাজা মহতী জনসভার মধ্যে বললেন- “মুনিবরের দন্তধাতু শুভ্র ছিল। যদি এটি সত্যিই জিনের ধাতু হয়, তাহলে এটি শুক্রতারার মতো শুভ্র ও উজ্জ্বল হবে। কিন্তু বর্তমানে এটি মলিন দেখাচ্ছে কেন?” রাজার এই কথা শেষ হতে না হতেই মুনিরাজের দন্তধাতু রাজহংসী যেমন তার যুগল পক্ষ প্রসারিত করে, তেমনিভাবে আকাশে উঠে কিরণরাশি বিকীর্ণ করতে করতে দ্রুত আবর্তিত হতে লাগল। রাজা তখন একটি শ্বেত মূল্যবান বস্ত্র দ্বারা ধাতুটিকে আবৃত করে উত্তম আসনে স্থাপন করলেন। পরে বর্ষা শেষে মেঘের মতো সুন্দর বিভিন্ন জাতির পুষ্পরাশি দ্বারা ধাতুটিকে আবৃত করা হলো। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই মুনিবরের দন্তধাতু সেই পুষ্পরাশির শিখরে উঠে প্রতিষ্ঠিত হলো। এরপর দুধসমুদ্রের ফেনের মতো শুভ্র একটি বস্ত্রখ-ের উপর ধাতুটি স্থাপন করে একশত মূল্যবান বজ্র দ্বারা আবৃত করা হলো। শাস্তার দন্তধাতু শত বস্ত্র ভেদ কওে শ্বেত মেঘের অভ্যন্তর থেকে চন্দ্রোদয়ের মতো উপরে উদিত হলো এবং কুন্দফুলের মতো শুভ্র জ্যোতি বিকীর্ণ করে চারদিক আলোকিত করল। এই অদ্ভুত প্রতিহার্য দেখে রাজা অত্যন্ত প্রমোদিত হলেন এবং রত্নাদি দ্বারা ধাতুর পূজা করলেন।
রাজা নিজ মন্তকে দন্তধাতু বহন করলেন। সুবিস্তৃত শ্বেতছত্রের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি জোড়া শ্বেত অশ্বে টানা সুসজ্জিত রথে আরোহণ করে লক্ষ্মীর লীলানিকেতন অনুরাধাপুর নগরে প্রবেশ করলেন। রাজা তাঁর দেবেন্দ্র-মন্দিরের ন্যায় অলংকৃত প্রাসাদে শ্বেতছত্রের নিচে সিংহাসনের উপর রেশমি গালিচা বিস্তৃত করে তার উপর মুনিবরের দন্তধাতু স্থাপন করলেন। মোক্ষসুখ লাভের আকাক্সক্ষায় প্রাসাদের অভ্যন্তরে একটি মহার্ঘ প্রকোষ্ঠ নির্মাণ কওে সেখানে দন্তধাতুকে নিরাপদে সংরক্ষণ করলেন এবং দিনরাত নানাভাবে পূজা করতে লাগলেন। দন্তকুমার ও হেমমালাকেও তিনি রতœাভরণাদি এবং ধনী ব্যক্তিদের অধ্যুষিত গ্রাম দান করে সম্মানিত ও সাহায্য করলেন। জনপদ, নিগম ও নগরের বাসিন্দারা সুগতের দন্তধাতু নিয়মিত দর্শন করতে না পেরে উৎকণ্ঠিত হয়ে একত্রিত হলেন। তাঁরা বুদ্ধের গুণকীর্তন করে বলতে লাগলেন- “ধর্মরাজ বুদ্ধ নিখিল জগতের হিতার্থে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং সর্বজনের হিতসাধন করেছিলেন। বহুজনের কল্যাণের জন্য তাঁর ধাতু পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়েছে। আমরাও সেই পবিত্র ধাতুর পূজা করতে চাই।” রাজা অনুরাধাপুরের উপকণ্ঠে বসবাসকারী ভিক্ষুসংঘকে সমবেত করে জনগণের এই আকাক্সক্ষার কথা জানালেন। তখন মহতী ভিক্ষুসংঘের মধ্যে মেধাবী ও করুণাময় এক ভিক্ষু সিংহলের অধিপতি রাজাকে বললেন- “যাঁরা নিজ অনুচরদের হিতসাধন করেন, তাঁরাই প্রকৃত মহত্ত্ব লাভ করেন। বসন্তকালে দন্তধাতু বাইরে এনে পুণ্যকামী জনগণকে দর্শন করানোই সনাতন ধর্ম।” ভিক্ষুর এই সুভাষিত বাক্য শুনে রাজা পুনরায় ভিক্ষুসংঘকে জিজ্ঞাসা করলেন- “এই বিপুল জনগণের দন্তধাতু পূজার জন্য কোন রমণীয় স্থান উপযুক্ত?” বিভিন্ন নিকায়ের ভিক্ষুগণ নিজ নিজ বিহার ও বাসস্থানের প্রশংসা করতে লাগলেন। রাজা তাঁদের কথাকে না সম্পূর্ণ গ্রহণ করলেন, না প্র্যাখ্যান করলেন। তিনি নিরপেক্ষভাবে বললেন- “মুনীন্দ্রের দন্তধাতু স্বয়ং মুহূর্তের মধ্যে তাঁর উপযুক্ত স্থানে গমন করবেন।” এরপর রাজা নিজ ভবনে ফিরে গিয়ে দন্তধাতু দর্শনের জন্য আগ্রহী জনগণের মুখে হাসি ফোটানোর উদ্দেশ্যে নগর ও বিহারের পথসমূহ সুন্দরভাবে সাজানোর নির্দেশ দিলেন।
রাজাদেশে নগরের রাস্তাগুলো পরিষ্কার ও সুন্দর করা হলো। সূর্যের তীব্র রশ্মির উত্তাপ নিবারণের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করা হলো। বায়ুতে ধ্বজাগুলো দুলে দুলে নৃত্য করতে লাগল। সুজাত ও কদলীবৃক্ষের সারি এবং বিভিন্ন বৃক্ষের সমারোহে পথগুলো বসন্তকালের বনভূমির মতো শোভা পেতে লাগল। ঝুলন্ত শুভ্র মুক্তামালায় বহু ম-প সজ্জিত করা হলো। সেখানে রাখা বহুমূল্য কুসুম থেকে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়তে লাগল এবং মধুমক্ষিকারা গুঞ্জন করতে লাগল। কেউ উৎসবের সাজে সজ্জিত হলো, কেউ কুসুমপূর্ণ ঝুড়ি হাতে চলল, কেউ সুগন্ধি চূর্ণ বহন করল এবং কেউ বৃহৎ চিত্রিত ছত্র হাতে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করল। লঙ্কাধিপতি ত্রিলোকতিলক বুদ্ধের দন্তধাতুকে চন্দ্রের মতো উজ্জ্বল, জোড়া অশ্বযুক্ত রতœপ্রভায় প্রজ্জ্বলিত শ্রেষ্ঠ রথে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তারপর ভক্তিপূর্ণ কণ্ঠে বললেন- “যিনি সম্বোধিলাভের জন্য বোধিম-পে গমন করেছিলেন, তীর্থিকদের পরান্ত করার জন্য গভা¤্রবৃক্ষের মূলে গমন করেছিলেন এবং ধর্ম প্রচারের জন্য ঋষিপতন মৃগদায়ে গমন করেছিলেন, সেই মহামুনি আজও যেন নিজেই তাঁর পূজার উপযুক্ত স্থানে গমন করেন।”
এই প্রার্থনার পর রাজা সারথিবিহীন মঙ্গলরথ ছেড়ে দিলেন। তিনি নিজে বহু পরিষদ সঙ্গে নিয়ে রথের পশ্চাতে গমন করতে লাগলেন এবং তুলনাহীন মহাপূজা করতে লাগলেন। মহতী জনতার করতালির শব্দ, তুরঙ্গের হ্রেষাধ্বনি, ভেরীর বাদ্য এবং হাতির গর্জনে সমগ্র নগর যেন সমুন্দ্রের মতো মুখরিত হয়ে উঠল। রথ যখন পূর্বদ্বারে জলযানের মতো এসে উপস্থিত হলো, তখন সমন্ত জনগণ ও ভিক্ষুগণ আনন্দিত হয়ে বিবিধ উপাচারে দন্তধাতুর পূজা করলেন। এরপর শ্রেষ্ঠ রথটি নগর প্রদক্ষিণ করে উত্তরদ্বার দিয়ে বাইরে গিয়ে সেই স্থানে উপনীত হলো, যেখানে স্থবির মহেন্দ্র পবিত্র ধর্মদেশনা করেছিলেন।
লঙ্কাধিপতি সেখানে সর্বজ্ঞ বুদ্ধের অতুলনীয় দন্তধাতুর পূজা করলেন। পরে নয় লক্ষ মুদ্রা ব্যয় করে মন্দিরের আয়তন বৃদ্ধি করলেন এবং নগরবাসীদের প্রতিদিন দন্তধাতু পূজার ব্যবস্থা করলেন। রাজা কিত্তিসিরিমেঘ দন্তধাতুকে অভয়গিরি বিহারে এনে এভাবে পূজা ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন এবং এই বিষয়টি স্মরণীয় করে রাখার জন্য একটি স্মারকলিপিও রচনা করিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বুদ্ধদাস প্রমুখ শ্রদ্ধাশীল ও দয়াগুণসম্পন্ন অন্যান্য সিংহলরাজাও এই ঐতিহ্য অনুসরণ করে বিভিন্ন উপায়ে ভগবান বুদ্ধের পবিত্র দন্তধাতুর পূজা ও সংরক্ষণ করেছিলেন।
কোন মন্তব্য নেই