মৌদগল্যায়ন স্থবির কি কর্মফল ভোগ করেছিলেন
মৌদগল্যায়ন স্থবির কি কর্মফল ভোগ করেছিলেন
সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু
গৌতম বুদ্ধের অন্যতম প্রধান শীর্ষ শিষ্য এবং অলৌকিক ঋদ্ধিশক্তির অধিকারী মহাপরিনির্বাণপ্রাপ্ত অর্হৎ মৌদগল্যায়ন (মহা মোগ্গল্লান) স্থবির তার জীবনের শেষ মুহূর্তে এক ভয়াবহ অতীত কর্মের ফল বা ভোগ করেছিলেন। অর্হৎ (যিনি সব ক্লেশ ও বন্ধন থেকে মুক্ত) হওয়া সত্ত্বেও তিনি কর্মের অমোঘ নিয়ম থেকে রেহাই পাননি। ( [1] lotus-happiness, [2] wikipedia, [3] wikipedia)। মৌদগল্যায়ন স্থবির যে পূর্বকর্মের ফল ভোগ করেছিলেন তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. অতীত জন্মের সেই অপরাধমূলক কর্ম:
বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, এক পূর্বজন্মে মৌদগল্যায়ন তার স্ত্রীর প্ররোচনায় পড়ে নিজের অন্ধ ও বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি তার পিতা-মাতাকে একটি বনের মধ্যে নিয়ে যান এবং ডাকাত দলের আক্রমণের ভান করে নিজের হাতে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেন। মৃত্যুর মুহূর্তেও তার অন্ধ পিতা-মাতা নিজেদের কথা চিন্তা না করে, সন্তানকে ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করে পালিয়ে যেতে বলছিলেন ( [1] lotus-happiness, [2] wikipedia, [4] handfulofleaves, [5] buddhanet)।
২. ইহজন্মে কর্মের ভয়াবহ ভোগ :
পিতা-মাতাকে হত্যার মতো গুরুপাপ বা 'আনন্তরিয় কর্ম'-এর কারণে তিনি বহু বছর নরকবাস করেন। নরক থেকে মুক্ত হয়ে পরবর্তী অনেক জন্ম পর এই শেষ জন্মে তিনি অর্হৎ বা মুক্ত মানব হন, তবুও সেই কর্মের অবশিষ্ট অংশ (কৰ্মফল) তার জীবনের শেষ মুহূর্তে ফলায়িত হয় [1] lotus-happiness, [2] wikipedia, [5] buddhanet, [6] lotus-happiness, [7] baike.baidu, [8] reddit, [9] baike.baidu, [10] lotus-happiness, [11] encyclopediaofbuddhism ) :
ঘাতকদের দ্বারা নৃশংস আক্রমণ:
এক প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্ররোচনায় একদল ভাড়াটে ডাকাত অর্হৎ মৌদগল্যায়নকে হত্যা করার জন্য ঘেরাও করে।
ঋদ্ধিশক্তির নিষ্ক্রিয়তা:
অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কর্মের পরিপক্বতার কারণে সপ্তম দিনে তার ঋদ্ধিশক্তি কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
নৃশংস মৃত্যু:
ডাকাতরা তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে শরীরের হাড়গোড় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায় ( [6] lotus-happiness, [8] reddit, [9] baike.baidu, [10] lotus-happiness, [11] encyclopediaofbuddhism )।
পরবর্তীতে ভাঙা শরীর নিয়েই তিনি অলৌকিক শক্তিতে শেষবারের মতো বুদ্ধের কাছে গিয়ে বিদায় নেন এবং মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। এই কাহিনীর মূল শিক্ষা হলো, ঋদ্ধিশক্তি বা আধ্যাত্মিক মুক্তি কোনোটিই অতীতের গুরুতর অকুশল বা পাপ কর্মের ফল থেকে মানুষকে বাঁচাতে পারে না( [2] wikipedia, [5] buddhanet, [6] lotus-happiness, [11] encyclopediaofbuddhism)।
বৌদ্ধ দর্শন অনুসারে, মাতা-পিতা হত্যা একটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ যাকে 'আনন্তরিয় কর্ম' (Grave Offenses) বলা হয়। এই কর্মের ফলস্বরূপ অপরাধীকে সরাসরি সবচেয়ে ভয়াবহ এবং গভীরতম নরক 'অবিচি' (Avici Hell)-তে পতিত হতে হয় ([1] wikipedia, [2] wisdomlib )।
মৌদগল্যায়ন স্থবির এই ভয়াবহ নরক থেকে যেভাবে মুক্ত হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে অর্হৎ হয়েছিলেন, তার মূল কারণগুলো নিচে ব্যাখ্যা করা হলো [3] wikipedia ):
১. বৌদ্ধ দর্শনে কোনো নরকই চিরস্থায়ী নয়:
বৌদ্ধ মহাবিশ্বতত্ত্ব বা সৃষ্টিতত্ত্ব অনুসারে, সৃষ্টিতে কোনো স্বর্গ বা নরকই চিরস্থায়ী বা অনন্তকালের জন্য নয়। কোনো সত্ত্বা নরকে ততক্ষণই থাকে, যতক্ষণ না তার সেই নির্দিষ্ট অকুশল বা পাপ কর্মের শক্তি সম্পূর্ণ শেষ বা ক্ষয় হয়। মৌদগল্যায়ন স্থবির তার কৃতকর্মের তীব্রতার কারণে লাখ লাখ বছর অবিচি নরকে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে শাস্তি ভোগের মাধ্যমে একপর্যায়ে তার সেই নরকবাসের মূল কর্মফল শেষ হয় এবং তিনি প্রাকৃতিকভাবেই সেখান থেকে মুক্তি পান ( [4] vivekavani, [5] dharmawheel, [6] dharmawheel, [7] wisdomlib, [8] reddit, )।
২. পূর্বের বিপুল পরিমাণ কুশল (পুণ্য) কর্মের শক্তি:
মৌদগল্যায়ন কেবল একটি জন্মেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তার বহু পূর্বের জন্মগুলোতে সঞ্চিত বিপুল পরিমাণ কুশল কর্ম বা পুণ্যফল ছিল। বৌদ্ধ নিয়ম অনুযায়ী, একটি তীব্র পাপের কারণে তাকে নরকে যেতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নরকের শাস্তি শেষ হওয়ার পর তার পূর্বের সুপ্ত পুণ্য বা কুশল কর্মগুলো আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই পুণ্যবলের কারণেই তিনি পুনরায় মানবকুলে উচ্চ বংশে জন্ম নেওয়ার সুযোগ পান ( [9] ancient-buddhist-texts, [10] mahamevnawanj, [11] obo.genaud, [12] buddhistnuns, [13] wikipedia, )।
৩. কর্মের অবশিষ্ট অংশ (কৰ্মফল) ইহজন্মে ভোগ:
নরক থেকে মুক্ত হলেও মাতা-পিতা হত্যার মতো গুরুতর পাপের অবশিষ্টাংশ পুরোপুরি শেষ হয়নি। কর্মের নিয়ম এতটাই নিখুঁত যে, তার শেষ জন্মেও (যখন তিনি গৌতম বুদ্ধের প্রধান শিষ্য এবং পরম অর্হৎ) সেই পাপের অবশিষ্ট ফল তাকে ভোগ করতে হয়েছিল। এই কারণেই তিনি ডাকাতদের দ্বারা আক্রান্ত হন এবং তার শরীরের হাড়গোড় পিটিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া হয়। ( [4] vivekavani, [10] mahamevnawanj, [14] dhammawheel, [15] lawsofthenature, [16] puritatpagoda, )।
৪. জ্ঞান ও সাধনার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক মুক্তি (অর্হত্ব লাভ):
নরক থেকে মুক্তির পর মানব জন্মে এসে তিনি চরম বৈরাগ্য ও তীব্র সাধনা শুরু করেন। গৌতম বুদ্ধের সান্নিধ্যে এসে তিনি পরম সত্য উপলব্ধি করেন এবং সমস্ত মানসিক ক্লেশ ও আসক্তি জয় করে 'অর্হৎ' পদ লাভ করেন। অর্হৎ হওয়ার কারণে এই জন্মেই তার জন্ম-মৃত্যুর চক্র (সংসার) চিরতরে শেষ হয়ে যায়। ([3] wikipedia, [12] buddhistnuns, [17] hinduwebsite,)।
পরিশেষে বলা যায় তিনি কোনো অলৌকিক ক্ষমা বা ঐশ্বরিক কৃপায় নরক থেকে মুক্ত হননি। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে শাস্তি ভোগ করে কর্মের তীব্রতা ক্ষয় করার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবে অবিচি নরক থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই